বাংলা গল্প - শুঁটকিভুনা Bengali story shutkibhuna Bangla golpo sutkibhuna
(না না রেসিপি না, এটাই গল্পের নাম 😄, যারা পছন্দ করেন না একটু কষ্ট করে পড়ে নেবেন ।)🙏
মা বলছিলাম যে আজকে একটু কাতলা কালিয়া করি কষা কষা করে ।
- না না কালকেই তো তেলে ঝোলে হল , আজকে পাতলা করে আলু বড়ি দিয়ে করবো।
- তোমায় করতে হবে না ,তুমি গুছিয়ে দাও আমি করবো পুজো সেরে । এবাড়িতে কারোর তেল মশলা খাওয়ার অভ্যেস নেই তো , তাছাড়া বিয়েতে প্রচুর খাওয়া দাওয়া হয়েছে এখন হালকাই ভালো ।
শুনেই মুখটা চুপসে গেলো জয়ীতার , আর ও হালকা ! কালকের রান্নাটা নাকি তেলে ঝোলে ছিল , শুধুই তো ঝোল ছিল তেল কোথায় ছিল !মনের কথা মনেই রাখলো জয়ীতা ।
এতো ভারী জ্বালা হলো ,বিয়ে করে খাওয়া লাটে উঠে গেল পুরো । খাওয়া ছাড়া জীবনে আছে নাকি কিছু ?
সত্যিই ভাগ্য করে শ্বশুরবাড়ি পেয়েছে জয়ীতা , সব তো ঠিকই ছিল কিন্তু সমস্যা তো অন্যখানে। সৌরভ রা কলকাতার বাসিন্দা কয়েক পুরুষ ধরে , আর জয়ীতা হলো চট্টগ্রামের বাঙাল ।
বাবা কাকা ছোটো থাকতে এদেশে এলেও খাওয়া দাওয়া তো পুরোপুরি ওদেশের । শুঁটকি ভুনা , লোটে মাছের ঝুড়ি , কচু বাটা ,এইসব ছাড়া বাঁচতে হবে স্বপ্নেও ভাবেনি কোনোদিন জয়ীতা, শুধু কি এইসব? তেল মশলাটাও বাদ চলে গেছে এমনকি শুকনোলঙ্কাও ঢোকেনা এবাড়িতে।
কতবার বলেছিল বিয়ের আগে বাঙাল ছাড়া বিয়ে করবে না, শুনলো কই মা বাবা? কপাল খারাপ থাকলে যা হয় , এবারও তো অশান্তি কম করেনি , কিন্তু বাবা মার চিৎকারে ধোপে টেকেনি ।
- শোনো কী বলে শোনো তোমার মেয়ে , ছেলে এদেশী বলে বিয়ে করবে না । ওরে এতো ভালো ছেলে পাবি আর ? সরকারি স্কুল মাস্টার , কলকাতায় এত সুন্দর বাড়ি ,ছোটো পরিবার ।
মা ও পই পই করে বলে দিয়েছিলো,
- শোনো মা দয়া করে প্রথম আলাপেই জানতে চেয়ে বসো না শুঁটকি মাছ খায় কিনা ,
ছেলে কিন্তু এদেশী ,নাক মুখ সিটকে বিদায় নেবে ।
ধুর! কি হবে সরকারি চাকরি দিয়ে যদি খেতেই না জানে । বাড়ি টাও দূরে , যখন ইচ্ছে চলে যাবে তার উপায় নেই । গেলেও তো পতিদেব সঙ্গে যাবেন । ছুটির তো অভাব নেই । স্কুল মাস্টার হলে যা হয়।
দুপুরে খেতে বসে বলেই ফেললো জয়ীতা ,
- তোমরা রুই কাতলা ছাড়া আর কোনো মাছ চেনো ?
- যাহ বাবা সবই তো খাই । রুই , কাতলা ,চিংড়ি , ইলিশ ।
- আর ?
- কী আর ?
- ওই চারটেই ?
- আমি অত চিনি না , বাবা যা আনে খাই । তবে সব খাই বললাম বলে আবার ভেবো না শুঁটকি খাই ; আমরা ভালো টাটকা মাছ খাই ,ওইসব পচা ধচা খাই না ।
কথা টা শুনে যা খেপেছিল জয়ীতা সদ্য বিয়ে করা স্বামী না হলে চড় একটা বসিয়েই দিত গালে ।
- তুমি এইভাবে শুঁটকি মাছ কে অপমান করতে পারো না । আর না খেয়েই বুঝে গেলে সব ? খেয়ে দেখো একবার তারপর বলো ।
- থাক থাক রক্ষে করো , পাশের বাড়ির জেঠিমা করে , ঘরের দরজা জানলা বন্ধ করে বসে থাকতে হয় এমন গন্ধ ,আবার নাকি খেয়ে বলতে হবে !
জয়ীতার মুখটা দেখে এবার সত্যি মজা লাগছিল সৌরভের ।
- আরে জানোই তো বাবার আর আমার দুজনেরই পেটের প্রবলেম তাই ছোটো থেকে এইরকমই রান্না খেয়ে আসছি ।আচ্ছা আজ আর নিয়ম নয় , রেস্টুরেন্টে যাবো , ডিনার করবো , বিরিয়ানি আর চিকেন চাপ ।
- দরকার নেই । তুমি বড়ির ঝোল খাও ।
ভাতের থালা নিয়ে গজগজ করতে করতে উঠে গেলো জয়ীতা।
রাগ ভাঙিয়ে বিকেলে বিরিয়ানি আর চাপ খেয়েছিল ঠিকই কিন্তু সে সুখ পেটে সইলো না সৌরভের। মাঝরাত থেকেই পেটে মোচড় দিয়ে শুরু হয়ে গেছে, ৬ বার হলো এই নিয়ে ।
নীলিমাও দুচার কথা শুনিয়েছে সকাল সকাল । ছেলের শরীর খারাপ হলে তাঁর আবার মাথার ঠিক থাকে না , সকাল থেকে ডাকেওনি জয়ীতাকে , অনুই রান্নার কাজ এগিয়ে দিচ্ছিল হাতে হাতে । আট বছর কাজ করছে এই বাড়িতে অনু , নীলিমা ক্ষেপে গেলে যে তাঁর কাজ বেড়ে যায় জানে সে । বাসন নিতে গিয়েই চোখে পড়লো সবজির ঝুড়িটা ।
- ও কাকী , তোমাদের আবার কচু কে দিল গো ?
- কেউ দেয়নি কেনা হয়েছে , তোমার নতুন বৌদিমনি আনতে বলেছিল , ও তুই নিয়ে যাস , কে খাবে ? বাবাই এর শরীর খারাপ , এখন আর ওইসব খেয়ে কাজ নেই ,গলা ধরে বিপদ বাড়ুক আর কী ।
কাজ ফেলে জয়ীতার ঘরে গেল অনু ,
- দাদার শরীর খারাপ শুনলাম , কী হয়েছে গো বৌদিমনি ?
- আর কী হয় এই বাড়িতে ? পেট খারাপ । নাও এবার সবাই মিলে কাঁচকলার ঝোল খাও । কাল কচু আনালাম ,ভাবলাম নারকেল পোস্ত সর্ষে দিয়ে কচু বাটা করবো একটু । ধুর !
- ওমা ওই কচু তো আমায় নিয়ে যেতে বলল । তুমি খাও কচুবাটা ? তোমরা কি বাঙাল নাকি গো বৌদিমনি ?
- হ্যাঁ গো । চট্টগ্রামের আমরা । মা বাবা দুজনেই ওখানকার।
- তাই ! আমরাও তো ওদেশের । তাহলে তো শুঁটকি মাছও খাও তুমি ।
- খাবো না আবার ? আমাদের বাড়িতে তো প্রায়ই হতো , আমাদের ঘরে নাহলে কাকীর ঘরে , শুঁটকি মাছ পেলে আমার আর কিচ্ছু লাগেনা । কিন্তু এখনতো সব বন্ধ ।
- ওমা ! বন্ধ কেনো হবে ? আমি তো খাই , সে আমি করলে তোমায় দিয়ে যাবো খন ।
- সত্যি ! কী খুশি যে হলাম কী বলবো তোমায়, উফ! ভাগ্যিস তুমি ছিলে এবাড়িতে , ও দেশের কাউকে পেলে কী যে ভালো লাগে ।
-এই তোমরা কী কী খাও ?
- সবরকমই হয় গো , ভাই আসলেই তো ঐদেশ থেকে মাছ নিয়ে আসে নানা রকম ।
- ভূনা খাও ? মানে ভর্তা যেটা , ওই বেটে যেটা করে । আদা ,রসুন, পিয়াজ শুকনো লঙ্কা বাটা দিয়ে লাল লাল করে বেশ মাখা মাখা ।
- উফফফ ওই দিয়ে তো এক থালা ভাত খেয়ে ফেলবো ।
সৌরভ দেখছিল জয়ীতাকে । সামান্য শুঁটকি মাছের সন্ধান পেয়ে কেউ যে এত খুশি হতে পারে প্রথম দেখছে ,যাক বাবা শুঁটকির সমস্যা মিটলো । নাহ্ একটু ক্ষ্যাপা হলেও মানুষ টা একদম খাঁটি সোনা । তবে শুঁটকির রেসিপি টা শুনে পেটটা যেন আবার মোচড় দিয়ে উঠলো সৌরভের ।
কলমে - প্রীতি চক্রবর্তী
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Your comment is valuable to us thank you and please subscribe through email