" হ্যাঁ মেয়ে পাশের ঘরে পড়ছে। হ্যাঁ… এই মাস্টার্স শেষ করল, এখন টিউশন করে ঘরে। হ্যাঁ চেষ্টা তো করে….ও মা তাই নাকি? বাঃ খুব ভালো খবর গো। " পাশের ঘরে সুবর্ণলতা পড়তে পড়তে শোনে তুতুন ফোনে ওর মায়ের বলা কথা গুলো। এই কথা শুনেই বুঝতে পারে কোনো আত্মীয় ফোন করেছে তুতুন এখন কি করছে আর কার ছেলের প্রমোশন হয়েছে, কার মেয়ে বিদেশে সেটলড, কে আবার ডব্লু বি সি এস অফিসার হওয়ার পরীক্ষায় বসে একবারেই চান্স পেয়ে গেছে ইত্যাদি ইত্যাদি খবর জানাতে। তাই আজকাল আর কোনো আত্মীয়র ফোন ধরে না ও। কিইবা উত্তর দেবে ও? এখনো কিছু জোটাতে পারেনি? অনেকে তো আবার বলেই দেয় " আসলে কি জানিস তো বাংলায় স্কোপটা খুব কম। ওই এক শিক্ষকতা ছাড়া গতি নেই।" এরাই আবার শিক্ষক দিবসে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয় " TEACHING IS THE ONE PROFFESSION THAT CREATES ALL OTHER PROFFESSIONS." হাসি পায় তুতুনের এসব দেখে। দুঃখও হয় খুব। ঠিক দুঃ খ নয় কেমন একটা যেন দম বন্ধ হয়ে আসা খারাপ লাগা। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে এখনো বাবাকে রোজ কাজে বেরোতে দেখতে ভাল লাগে না আর। মা অনেক সাপোর্ট করে ওকে, চেষ্টা চালিয়ে যেতে বলে কিন্তু তবুও মায়ের ও হয়ত ইচ্ছা করে যে তার মেয়েও রোজ অফিসে যাক। কবে পূরণ করতে পারবে ও এই আশা? আদৌ পারবে?
খুব একটা বাইরেও আজকাল বেরোয় না। যদি কেউ জিজ্ঞেস করে কিরে কি করছিস এখন? কিসে মাস্টার্স করলি? এই উত্তরটা দিতে ও আজকাল ওর কেমন ভয় লাগে। বাংলায় অনার্স নিয়ে মাস্টার্স করেছে বলার পরই তাদের মুখের ভাবভঙ্গি এতই সুখকর হয় যে মনে হয় ও কোনো দণ্ডনীয় অপরাধ করে ফেলেছে। মনে মনে এই লোকগুলিকে গরিলা শিম্পাঞ্জি বলে মনের ঝাল মেটায় ও। তবে আস্তে আস্তে ও বুঝতে পারছে যে ওর ভদ্রতার বাঁধন আলগা হচ্ছে। কারণ বিগত ছয় মাস ধরে এইরকম কথাবার্তা শুনতে শুনতে ও ক্লান্ত। তুতুনের মা কেও শুনতে হয়," কি গো মেয়ে চাকরি বাকরির চেষ্টা করে কিছু? " এমন তাদের জিজ্ঞাসার ভঙ্গি যেন চাকরি মুড়ির মোয়া হাত পাতলেই দিয়ে দেবে বা উনি নিজেই এতবড় হনু যে চাকরির ব্যবস্থা করে দেবেন। এতকিছু মনে হওয়ার পরও ও কেমন মুষড়ে পড়ে। মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যর্থ সবচেয়ে অপদার্থ ও। বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে ওর। চোখের জল লুকোতে ঘর অন্ধকার করে বসে থাকে নয়ত ছাদে গিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। ও কি তবে একটা শিক্ষিত বোঝা? যেই বোঝার একটা মাস্টার্স ডিগ্রি আছে।
এর মধ্যেই তো একদিন বেলার দিকেই মা বারান্দায় জামাকাপড় মেলছিল, আর ও পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। পল্টু কাকু দোকান থেকে জিনিস নিয়ে ফিরছিল। তুতুন আর ওর মাকে দেখে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, "কি বৌদি কেমন আছেন? তুতুন, তা কি খবর মা কেরিয়ারের? জানেন বৌদি, আমার মেয়েকে ম্যানেজমেন্টে ভর্তি করে দিয়েছি। কোর্স কম্পলিট হলে ওরাই চাকরির ব্যবস্থা করে দেবে।" তুতুনের মনে হল এই চরম সুখবরটা দিতেই পল্টু কাকু হয়ত দোকান ফেরত দাঁড়িয়ে ছিল। ও আর দাঁড়াতে পারল না, ঘরে চলে এল। হয়ত ওর মায়ের বুকটাও খানিকটা তপ্ত হয়েছিল তখন। মাঝে মাঝে ওর মনে হয় যদি ওর কাছে একটা আলাদিনের প্রদীপ থাকত তবে প্রদীপ ঘষে প্রদীপের দৈত্যকে বলত, " একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিন দয়া করে। আমি আর পারছি না দেখতে বছর পঞাশোর্ধ বাবাকে ধুঁকতে ধুঁকতে রোজ কাজে বেরোতে। ঘামে জর্জরিত অবস্থায় বাজারের থলিটা বয়ে আনতে। আমি আর আর পারছি না হাজারো মানুষের জিজ্ঞাসার সামনে আমার মায়ের মুখটা ম্লান হয়ে যেতে।" দীর্ঘশ্বাস ফেলে তুতুন। কি ভাবছে ও? সত্যি মাঝে মাঝে কি যে আবোল তাবোল ভাবে ও।
আজ সকাল থেকেই তুতুনের মেজাজটা ভালো নেই। বাবার সাথে একটু মন কষাকষি হয়েছে। তাই চুপচাপ আছে। কয়েকটা লাল কালির পেন কিনতে হবে ওকে আজ। স্টুডেন্ট গুলোর খাতা চেক করতে করতে আগের পেনের কালি শেষ। মাকে বলে টাকা নিয়ে ও বেরোল পাড়ার দোকানের দিকে। হঠাৎ মুখোমুখি হতে হল পাশের ফ্ল্যাটের টুকলাই দার মার সাথে।তুতুন মনে মনে বলল "উফফফফফ.. নাও এবার শুরু হবে প্রশ্নবান।"
"কোথায় যাচ্ছিস রে?" টুকলাই দার মা বলল।
" এই একটু পেন কিনতে জেঠিমা। " তুতুন উত্তর দিল।
" ও আচ্ছা। তা মা বাবা ভাল আছে তো? তুই কিছু করছিস মানে কোনো চাকরি টাকরি পেয়েছিস কিছু?" টুকলাই দার মা বলল।
তুতুন সাথে সাথেই আজ উত্তর দিল," হ্যাঁ গো পেয়েছি একটা জব। তুমি জানো না?"
" কই না তো! এই কবে পেলি রে? আর কিসে পেলি? দেখ সেদিন তোর বাবার সাথে বাজারে দেখা হল একবারও বলল না খবরটা। "
তুতুন বলল" বাবা আসলে ভুলে গেছে বলতে। আমি গত ছয় মাস আগে FATHER'S HOTEL নামে একটা কোম্পানির জেনারেল স্টাফ ছিলাম। এখন বেকার কোম্পানির CHIEF EXECUTIVE। একদিন এসো গো জেঠিমা বাড়িতে চা মিষ্টি খেয়ে যেও। আজ আসি গো দেরী হলে মা আবার চিন্তা করবে যে। " বলে সামনের দোকানের দিকে হাঁটা লাগালো তুতুন। আজকের রোদের তাপটা যেন একটু বেশিই গায়ে লাগছে।
সমাপ্ত।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Your comment is valuable to us thank you and please subscribe through email