
বাংলা গল্প - সুখ Bengali story sukh Bangla golpo sukh , bongolikhon
ভাত ,ডাল ,আলু পটলের তরকারি ,মাছের ঝোল ,চাটনি চটপট বাটিতে সাজাচ্ছে অপর্ণা । দশ বাড়ির খাবার সুমন বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেয়। আজ একটু বেশি সকাল-সকাল শুরু করেছে ছেলের স্কুলে মিটিং আছে সেখানে যেতে হবে। হাতের জাদুতে বেশ কয়েক মাসের মধ্যেই সারা ফেলে দিয়েছে অপর্ণার হোম ডেলিভারির ব্যবসা । এখন ছোট বড় অনুষ্ঠানেও খাবার পৌছে দিচ্ছে , প্রয়োজনে লোক নিয়ে নেয়।
তুমি কিন্তু বিকেলে কোন কাজ রেখো না চৌধুরীর বাড়ি যাবো কথা বলতে , খাবারগুলো ব্যাগে ভরতে ভরতে সুমনকে বলল অপর্ণা । সুমন চুপ , এইসময় যদি বলে বিকেলে সৌরভ কে আসতে বলেছে আঁকার ব্যাপারে কথা বলতে তাহলে আর রক্ষে নেই তাও বললো ,তুমি তো মা দশভূজা সব একাই সামলে নাও । থাক হয়েছে , মন ভুলানো কথা বলতে হবেনা, সব আমি সামলাবো না ? ছেলের স্কুল, রান্নার কাজ ; আচ্ছা বাবা যাব , আর তুমি জানো মন ভোলানো কথা নয় এগুলো, তুমি এইভাবে সব টা না সামলালে কী করতাম আমি সত্যি জানি না । আচ্ছা এবার যাও খাবার গুলো পৌছে দিয়ে এসো , দেরি হচ্ছে তো। সুমন জানে ইচ্ছে করেই ওকে চুপ করিয়ে দেয় অপর্ণা , চাকরি চলে যাওয়ার পর কোন রকম একটা দোকানে কর্মচারীর কাজ নিয়ে ঢুকেছিল, অপর্ণা ব্যবসা শুরু না করলে সংসারটা ভেসে যেত । শুধু অপর্ণা সংসারের হাল ধরেছে বলে আঁকার স্কুল টা খুলতে পেরেছে সুমন ,না হলে এই ঝুঁকি টা নেওয়া সম্ভব হতো না। এইসব ভাবতে ভাবতেই স্কুটারে স্টার্ট দেয় সুমন ।
সূর্য দপ দপ করে জ্বলছে মাথার উপর , শীততাপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ি থেকে নামে অরিন্দম চৌধুরী। পৈতৃক ব্যবসার বেশির ভাগ টাই সেই সামলায় এখন। সবকিছু নিজের বশে রাখার পছন্দ তার এমনকি নিজের স্ত্রী উদিতা কেও । স্বামী কে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে দেখলে খুব একটা খুশি হয় না উদিতা ,নিজের ঘরে একা থাকার সময় টুকু শেষ হয় বলেই হয়ত । পোশাক বদলাতে বদলাতে বলে অরিন্দম , সন্ধ্যেবেলা তৈরি থেকো কটা নিমন্ত্রণ সেরে আসবো , কিন্তু আজ ওবাড়ি যাওয়ার কথা ছিল যে ,জানে আর বলে লাভ নেই তাও বলল উদিতা । সে তুমি পরে চলে যেও বলেই বাথরুমে চলে গেল অরিন্দম । কষ্ট টা বাপের বাড়ি না যেতে পারার নয়, সকাল থেকে মেয়ে জামাইয়ের পছন্দের রান্না গুলো করে রেখেছিল মা । আসলেই বড় বাড়ির বউ হওয়া টা বাইরে থেকেই সুন্দর অন্দরমহলের গল্পটা যদি কেউ জানতো তাহলে বুঝতে পারত ,সে ঘর সাজানোর পুতুল ছাড়া আর কিছুই নয় । কাল যদি সে মরেও যায় সত্যি কি কেউ অভাব বোধ করবে তার এ বাড়িতে ওই পেটের ছেলে টা ছাড়া ?তাকেও হয়তো ভুলিয়ে দেবে দামী দামী খেলনা দিয়ে । ছেলে টাকেই বা কাছে পায় কতক্ষন , ঠাকুমা তো নাতি কে চোখের আড়াল করে না ।রূপের জোরে বাকি সবাইকে পিছনে ফেলে অরিন্দম চৌধুরী বউ হয়েছে সে, কিন্তু কেউ যদি তাঁর মন টাকেও বুঝত একটু , অবশ্য অরিন্দম চৌধুরী ভাবে টাকা দিয়েই পৃথিবীর সব সুখ কেনা যায় , তাই উদিতাও সুখী । মা বাবা ও বোঝে এখন মেয়ের বড়লোক শ্বশুর বাড়িতে সম্মান রাখতে গিয়ে তাদের মধ্যবিত্ত পরিবারে বেশ টান পড়ে ।
টেবিলে ছেলের খাবারের থালা সাজাচ্ছিল অনুরাধা , উদিতা কে দেখে বলে শোনো , বাড়িতে বলে দিও যেন সকাল-সকাল জন্মদিনে তত্ত্ব টা পৌঁছে দেয় সবাই দেখত তাহলে । উদিতা মৃদু স্বরে বলে , ছোট করে তো হচ্ছে মা ,আবার শুধু শুধু এইসব তত্ত্বের কী প্রয়োজন ? দেখো যেটা বোঝোনা সেটা নিয়ে কথা বলো না ছোট করে হলেও আত্মীয়রা তো আসছে, আর আমার একমাত্র নাতির জন্মদিন, দুই বাড়ির মানসম্মানের ব্যাপার , আর হ্যাঁ অনুষ্ঠানের দিন আবার নিজে নিজে সাজতে যেও না, পার্লারের মেয়েটাকে ডেকে নিও , একরকম আদেশ দিয়ে নিজের কাজে মন দিল অনুরাধা ।
বিকেল ৫ টা , সুসজ্জিত ঘরে দামি সোফায় বসে আছে অপর্ণা আর সুমন , কথা অনুযায়ী সময়ের আগেই এসে পড়েছে । সরি একটু লেট হয়ে গেল অনেকক্ষণ এসেছেন বুঝি জিজ্ঞেস করল অরিন্দম , সময় না দিয়ে মূলকথায় চলে গেল সরাসরি, বড়লোকরা বোধহয় নিজেদের ব্যস্ত দেখাতে পছন্দ করে । মনে মনে ভাবল সুমন । দু গ্লাস কোল্ড ড্রিঙ্কস নিয়ে বসার ঘরে এল উদিতা ,অপর্ণা দেখছিল উদিতাকে , হিংসা করার মতোই রূপ । দেখুন আপনাদের নাম আগে শুনেছি ,এক বন্ধুর পার্টিতে খেয়েছিলাম আপনাদের রান্না বেশ ভালো তাই কাজটা আপনাদেরই দিতে চাই । ব্যবসাটা কি আপনারা দুজন মিলেই করেন ? জিজ্ঞেস করলো অরিন্দম । সব আমার স্ত্রী সামলায়, আমি সাহায্য করি মাত্র মৃদু হেসে বললো সুমন । হাসিটা বেশ গর্ব আর অহংকার মেশানো লক্ষ্য করলো উদিতা। অপর্ণা সাথে সাথে বললো আসলে ও পাশে না থাকলে আমি পারতাম না , বাজার করা ,খাবার পৌঁছানো সব ও করে। বেশ ,আসল কথায় আসা যাক তাহলে ,সকালে পঁচিশ,আর বিকেলে দেড়শো মতো লোক হবে , টাকা নিয়ে প্রবলেম নেই খাবার যেন ভাল হয় । আমাদের রান্নার কোয়ালিটি নিয়ে আপনার কোনো চিন্তা নেই বললো অপর্ণা , আমরা রান্না করেই বাড়িতে পৌঁছে দিই, তবে আপনারা চাইলে এখানেও করতে পারি, সেক্ষেত্রে মেনুটা আলোচনা করে নিলে ভালো হয় । মাকে ডাকে অরিন্দম , যেরকম ঠিক হয়েছিল সেই মতো বলে , ফিস বাটার ফ্রাই , কুলচা, চানা মশলা , বাসন্তী পোলাও, মটন কষা ,চাটনি, পাঁপড় । চানা মশলার বদলে পনির করলে হতো না ? বললো উদিতা । আহ্ বলছি তো আমি কথা ,আর পনির এ বাড়িতে কেউ পছন্দ করেনা তুমি তো জানো । জানে উদিতা, কিন্তু সে যে বাড়ির কেউ না সেটা জানত না । চুপচাপ দাঁড়িয়ে অপর্ণা আর অরিন্দমের কথোপকথন শুনতে লাগলো উদিতা । দেখছিল অপর্ণাকে , একজন স্ত্রী কে, যে তার স্বামীর অহংকার , দেখছিল সুমনকে গর্ব করার মত জীবনসঙ্গী পেয়েছে , যার ছোট্ট জগতে তার বউ টাই সব ,কত সম্মান একে অপরের জন্য । সে কি পারত না বড়লোকের লোকদেখানো বউ না হয়ে অন্য কিছু হতে ? সারাদিন নিজের অস্তিত্ব খুঁজে না বেড়িয়ে কারোর জীবনে সব টুকু হতে ? গলার কাছে দলা পাকানো কষ্টটাকে কোনো রকমে সামলে নিয়ে মুখে হাসি ফোটালো উদিতা ।🙂
কলমে - প্রীতি চক্রবর্তী
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Your comment is valuable to us thank you and please subscribe through email