বাংলা গল্প হিসাব, bengali story hisab , bongo likhon
'এবারেও আমাদের কোম্পানী সবচেয়ে বেশি প্রোফিট করেছে। অন্য কোম্পানীগুলোকে পিছনে ফেলে আমরা আবারো এগিয়ে গেছি। আপনাদের সবার পরিশ্রম ছাড়া এটা সম্ভবই ছিল না। আপনাদের সকলকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আমরা এই ভাবেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যাবো।' নিজের ছোট্টো ভাষন শেষ করে চেয়ারে বসে পরে কোম্পানীর মালিক অরিন্দম। কনফারেন্স রুম তখন হাত তালিতে ফেটে পড়ছে। এরপর ধীরে ধীরে রুম ফাঁকা হয়ে গেলে একা বসে থাকে অরিন্দম। মনের মধ্যে চিন্তারা যেন জাল বুনে চলেছে। এতবড় একটা কোম্পানীর হিসাব মিলিয়ে চলেছে সে, কিন্তু নিজের জীবনের হিসাবটা কিছুতেই মেলাতে পারছে না সে। কিছুদিন হলো স্ত্রী পামেলার সাথে ঠান্ডা একটা যুদ্ধ চলছে তার। পামেলা তাকে সন্দেহ করতে শুরু করেছে। এমনকি ডিভোর্সের ও দাবী করেছে সে। আর তার প্রধান ও একমাত্র কারন অরিন্দমের নতুন সেক্রেটারী সোমা। কদিন হলো মেয়েটা চাকরিতে যোগদান করেছে আর এর মধ্যেই............. চিন্তাতে ছেদ পরে অরিন্দমের। দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকেছে সোমা। 'স্যার বাইরে সবাই আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। আসুন।' বলে বেরিয়ে যায় সোমা। কোম্পানীর ভালো প্রোফিট হওয়ার জন্য আজ একটা পার্টি অ্যারেঞ্জ করেছে সে। রুম থেকে বেড়ুতেই আর একপ্রস্থ হাততালির ঝড় বয়ে যায়। কিন্তু অরিন্দমের এখন কিছুই ভালো লাগছে না। ওয়াইনের একটা গ্লাস তুলে নিয়ে বড় কাঁচের দেওয়ালটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় সে। বারো তলার এই অফিসটা থেকে শহরের অনেকটাই দেখা যায়। কিন্তু শহরের মনটাও যেন আজ খারাপ। বৃষ্টি নামবে। মেঘ জমেছে। তার মনের মতোই। হঠাৎ হাতে নরম স্পর্শ অনুভব করে অরিন্দম। সোমা ডাকছে। 'স্যার আপনার কি কিছু হয়েছে?' নরম গলায় জানতে চায় সোমা। মেয়েটাকে দেখলে কেমন জানো করে ওঠে অরিন্দমের মনটা। মেয়েটার চোখে সে নিজের জন্য অনেক কিছুই খুঁজে পায় যেন! তবে কি পামেলার সন্দেহটাই সঠিক! নিজের অজান্তেই কি জড়িয়ে পড়ছে অরিন্দম! মনটাকে শক্ত করে সে। জীবনের হিসাবে এত সহজে গড়মিল হতে দেবে না সে। 'না কিছু হয়নি তো!' সোমার কথার উত্তর দিয়ে একপ্রকার পালিয়ে আসে অরিন্দম। বাড়ি ফিরতে হবে। বৃষ্টি এলো বলে। নিজের গাড়িতে গিয়ে ওঠে অরিন্দম। মনে মনে ভাবে পামেলার মন তাকে আবার নতুন করে জয় করতে হবে। অরিন্দমকে নিয়ে তার সন্দেহ যে ভুল সেটা বোঝাতে হবে। অরিন্দম যে শুধু তাকেই ভালোবাসে। আরো সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে ট্রাফিক সিগনালের লাল আলোর নিচে এসে দাঁড় করায় তার গাড়ী। ঘাড়টা ডানদিকে ঘোরাতে একপ্রকার চমকে ওঠে সে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না। পামেলাকে নিয়ে এত চিন্তাভাবনা নিমেষে ফানুস হয়ে উড়ে যায়। ডানদিকের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে পামেলা। তার কোমড় জড়িয়ে দাঁড়িয়ে এক অন্য পুরুষ। তবে কি নিজের কুকর্ম ঢাকতেই অরিন্দমের সাথে মিথ্যা ঝগড়া! বুঝে উঠতে পারেনা অরিন্দম। এদিকে সিগনালের আলো সবুজ হয়েছে। পিছন থেকে অন্য গাড়ীর হর্ণ শোনা যায়। অগত্যা এগিয়ে যায় অরিন্দম। বাইরে বৃষ্টি নামেনি! তবুও সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছে তার। মনের ওয়াইপার এই জলকে মুছতে অক্ষম। ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসে অরিন্দমের চোখে।
পরদিন হসপিটালের বিছানায় জ্ঞান ফেরে অরিন্দমের। চোখ মেলতেই দেখতে পায় বিছানার পাশে উদ্বিগ্ন মুখে বসে সোমা। ওঠার চেষ্টা করতেই এগিয়ে আসে সে। ধরে বসিয়ে দেয় অরিন্দমকে। স্ত্রী পামেলাকে না দেখে কিছুটা অবাক হয় অরিন্দম। সেটা বুঝতে পেরেই সোমা কাছে এসে বসে। আস্তে করে বলে 'পামেলা ম্যাম কাল রাতেই একজনের সাথে চলে গেছে!' অরিন্দম হয়তো তৈরী ছিল এমন কিছুর জন্য। আজ যে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে পামেলা নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করেছিল, সেটাকেই সত্য ঘটনার রূপ দিতে সোমার দিকে তাকায় সে। ছুঁচ বেঁধানো হাতটা সোমার হাতের উপর রেখে আলতো স্বরে জিজ্ঞাসা করে...... 'আমার জীবন খাতার হিসাবের গড়মিল গুলো তুমি মিলিয়ে দেবে সোমা?'.....
সৌরভ সেন
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Your comment is valuable to us thank you and please subscribe through email