বাংলা মজার গল্প (রম্য রচনা ) জামাই-ষষ্টি bengali funny story jamai shosti, bongo likhon
'চলো চলো,কী যে করোনা...'নিজের বাইকে স্টার্ট দিয়ে,এক্সিলেটার দাবায়ি বউ কে তাড়া দিয়ে উঠলো উত্তম।উত্তমের এবার চতুর্দশতম জামাইষষ্ঠী। কিন্তু সেই প্রথম বছর থেকে আজ অবধি তার জামাইষষ্ঠী উৎসবের উৎসাহে বিরাম নেই।কাল একটু বৃষ্টিও হয়েছে,রাস্তা ঘাট বেশ ধোয়া ধোয়া,গাছপালাও যেন চান ক'রে, সেজে গুজে পুরো তৈরি। উত্তমও তার অতি পছন্দের সবুজ পাঞ্জাবি টা পড়ে নিয়েছে।তরমুজ সাইজের মধ্যপ্রদেশ উঁচু হ'য়ে বেরিয়ে আসবো আসবো করছে।
'কই গো এসো...'আবার তাড়া দেয় বউ কে।উত্তমের আর তড় সইছে না।জামাইষষ্ঠী তার বড় পছন্দের উৎসব।শুধু একবার শশুরালয়ে ল্যান্ড করতে যতক্ষন,তারপরেই উত্তম বটব্যাল থেকে মুহুর্তে দামোদর বটব্যাল হয়ে উঠতে সময় নেয় না ও।মহাভোজেরও ওপরে যদি কিছু থাকে,উত্তম সেই ভোজের একাকী অংশীদার। উত্তমকে কোনো এক বিয়ে বাড়িতে এক দেখাতেই পছন্দ করেছিলেন,তার শশুর মশাই। সে বার উত্তম সাঁইত্রিশ পিস খাসির মাংস খাওয়ার পর যখন একান্নতম রসগোল্লা মুখে পুড়ছে,তখনই পাঁচকরি শাসমল ওর পিঠে চাপড় মেরে সর্বসমক্ষে ওকে হবু জামাই বলে ডিক্লেয়ার করেছিলেন।পাঁচকরি বাবুও এককালের নামকরা খাইয়ে।শোনা যায় উনিও তার কোনো এক বন্ধুর ঠাকুমার শ্রাদ্ধে উনসত্তর টা লুচি আর এক হাঁড়ি দই খেয়েছিলেন।'বুঝলে বাবাজী, তোমার বয়সে একটা আস্ত পাঁঠা খেয়ে নিতাম..'।তবে দু-চার কেজি পাঁঠার মাংস উত্তমের কাছেও কিস্যু না।স্রেফ উড়িয়ে দিতেই পারে,যখন তখন!তা সেই খাওনদার পরিবারের একমাত্র ওজনদার জামাই বলে কথা,সমাদর,আদর,ঢেলে উপড়ে আসাটাই দস্তুর।ইতিমধ্যে আরো দু একজন দম্পতি তার পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেলো,মোটরবাইকে।উত্তমের ইগো হার্ট করছে।প্রতিবার,ষষ্টির দু দিন আগে থাকতে পৌঁছে গিয়ে,দু দিন পর অবধি থেকে যাওয়াই ওর ট্র্যাডিশন।তবে এবছর 'করোনা' কৃপায় রেওয়াজের অদলবদল হয়েছে।তা বলে,সকাল ন'টা বাজলো,এখনো রওনা দেওয়া গেলো না',এ তার সহ্য হচ্ছে না।'কি হলো টা কী! তুমি কি আসবে না আমি একাই এগোবো?...'এমনিতেই লকডাউন চলছে।শোনা যাচ্ছে,আজ থেকে আরো কড়াকড়ি, রাস্তা বন্ধ করে দেবে,তখন মহা মুশকিল হবে,'ষষ্টি টাই পথে মারা যাবে'।গতমাসেই শশুর বাড়ি গিয়ে দেখে এসেছে,একটা মুস্কন্দ সাইজের খাজা কাঁঠাল গোকুলে বেড়ে উঠেছে।ভুরভুরে গন্ধ নিয়ে অপেক্ষা করছে জামাই এর পেটে ঢুকবে বলে।গতবছর, বাইশ পিস কাঁঠাল,গোটা ছয়েক আম,দশটা জলভরা খাওয়ার পর দুপুরে কেজি খানেক খাসির মাংস খেয়ে যখন বিকেলে একঘটি লস্যি খাচ্ছিলো,তখন শশুরমশাই বলেছিলেন,'তোমার কি শরীর ঠিক নেই বাবা,এবার যে কিছুই খেলে না হে...তোমার মতো বয়সে...''আহা,এই না হলে জামাই আদর..'
'ধুর,ধুর,কই গো...এসো...'এবার প্রবল অধৈর্য হওয়ার পালা।
উত্তমের মনটা খুব কু গাইছে,এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়েই দিন না কেটে যায়!কখন যাবে!কখন খেতে বসবে!ফার্স্ট রাউন্ডে লুচি মিষ্টি, তারপর সেকেন্ড রাউন্ডে চালিয়ে খেলবে বলে ঠিক করাই আছে।'ফালতু দেরি যত...'গজগজ করতে লাগলেন।
হঠাৎ ঘ্যাঁচ ক'রে আওয়াজ।ওর বাইক ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে এক মস্ত পুলিশের ভ্যান।পুলিশ দেখলে অকারণেই কেমন একটা ইয়ে হয় ওর।
'কী ব্যাপার? কোথায় যাবেন?'গম্ভীর কন্ঠ গাড়ির জানলা দিয়ে জানতে চায়।
'ইয়ে,মানে,ওই যে,শশুরবাড়ি!'
'শশুরবাড়ি কি পিসির বাড়ি সেটা জানতে চাওয়া হয়নি...'ধমকে ওঠে গম্ভীর শব্দ।
'না,মানে হ্যাঁ,ওই দক্ষিনগঞ্জ যাবো!'
'বাড়ি ঢুকে যান,এই মাত্র ওই এরিয়া কনটেইনমেন্ট জোন করে দেওয়া হয়েছে,আমরা এলাকা সিল করেছি...ভিতরে যাওয়া চলবে না!'
বয়সটা বছর পনেরো কম হলে উত্তম নির্ঘাত ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলে হাত পা ছুড়তো,কিন্তু মুখটা কাঁচুমাচু হয়েই গেলো।
'স্যার, আপনার ডিউটি তো শেষ হলো,আপনি বাড়ি যাবেন নাকি,আপনাকে ম্যাডামের বাড়িতে ড্রপ করবো?'
'হ্যাঁ,ওখানেই...ওরা সব আবার উপোষ করে বসে আছে...'
গাড়ির ভিতরের ছোট্ট কথোপকথন টা যেন স্পষ্ট শুনলো উত্তম।একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে,বাড়ি ঢুকে গেলো সে।বাড়ি গিয়ে বালিশে মুখ গুঁজে কেঁদেছিলো কি না আর জানা যায় নি।
---------
শৌভিক চ্যাটার্জী
খুব সুন্দর
উত্তরমুছুনধন্যবাদ আপনাকে, আমাদের সাথে যুক্ত হওয়ার জন্য।
মুছুন