চাকরির/(chakrir) জন্য পড়ার লাইনে আসার আগে আমি নানা দিকে ঢু মেরে দেখেছি, কিছুদিন হাওয়া খেয়েছি, আর সহজ রাস্তা খুঁজে বেড়িয়েছি। এইসব চক্করে পড়ে যখন অনেকটা বয়স হয়ে গেছে তখন টনক নড়েছে। যাই হোক, তার পরে কেমন কাটছিল দিনগুলো তার একটা বর্ণনা দিই তোমাদের।
বছর দুয়েক বাড়িতে বসে আছি, কোথাও বের হই না, পাড়ায় বট গাছের নীচে চায়ের দোকানে আড্ডাও মারতে যাই না, আত্মীয় বাড়ি ও অনুষ্ঠান বাড়িতে নমস্কার দিয়েছি। তবে আমার কিছু ভাই আছে, তাদের সাথে ফুটবল খেলাটাই একমাত্র মনোরঞ্জন ছিলো। আর ছিলো পড়ার ব্যাচের দাদা ও বন্ধুরা। তারা কেউ সাফল্য পেয়েছে, অন্যরা দোরগোড়ায় এবং এখানে বর্ণিত অবস্থায় লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। যাই হোক, এই সুবাদে আমার যেটা ক্ষতি হলো সেটা হলো, সকলেই জেনে গেলো আমি চাকরির জন্য পড়ছি। ব্যাস্, এবার শুরু অমার ভালো মন্দ খোঁজ নেবার নামে নিত্যদিন মানসিক অত্যাচার।
আমি বরাবরই জলদি ঘুমাই ভোরে উঠি। তার পরে কিছুক্ষণ বইপত্র নাড়াচাড়া করে ব্রাশ হাতে বাড়ির সামনে হাঁটাহাঁটি করতে বের হতাম। খালি পায়ে হালকা ভেজা নরম ঘাসের ওপর হাঁটালে মনটা খুশী হয়। এমন মধুর সকালেও আমি ভয়ে থাকতাম সবসময়। ঠিক ঐ রকম সময়েই পাড়ার এক ঠাকুমা ফুল তুলে ফিরতো। আর আমাকে যদি নাগালে পেতো, তবে হয়ে গেলো।
ভাই, কেমন আছো?
- ভালো।
এখন কি করো?
দেখি না কেনো তোমাকে?
কাজ বাজের কি খবর?
কোথাও ঢুকলে নাকি?
চাকরির জন্য চেষ্টা করো না কেনো?
রাম, শ্যাম, যদু... স্কুলে, পুলিশে, আর্মিতে পেয়ে গেলো। তুমিও চেষ্টা করো।
- হুম।
তুমি তো ভালো ছিলা পড়ায়, SSC দাও, হয়ে যাবে।
এই শেষ উপদেশটা শোনাতোই আমাকে। রোজ শুনতে শুনতে গা সওয়া হয়ে গেছিলো যদিও। কিন্তু শুরুতে খুব রাগ হতো, ভাবতাম দুদিন পরে ঘাটে উঠবে যে ঠাকুমা, SSC খায় না মাথায় দেয় সেটাই জানে না, সেও আমাকে এই জ্ঞান দিয়ে যায়? আমার এমন খারাপ দিন আসলো!! আমি তখন নানা পরীক্ষা দিয়ে রেখেছি, যাই রেজাল্ট দেখি হয় শুরুতে নয় শেষ বাজারে গিয়ে ঘচাং। এমন পরিস্থিতিতে এসব হলো কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে। এমন উদাহরণ প্রচুর। এটা নিশ্চিত যে, এই গ্রুপে কমবেশী সকলেই এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছো বা হচ্ছো।
সদ্যই এক ভাই তার অভিজ্ঞতা শোনালো। স্কুলে বেশিরভাগ সময় সে মনিটর ছিলো, রেজাল্টও ছিলো দারুণ। পাড়ার অন্য এক ছেলে ছিলো পুরো উল্টো। এই ভাইটা যে কোনও দিন ভালো চাকরি পেয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস; এখন পূর্ণ বেকার, আর ঐ বন্ধুটা অন্য রাজ্যে কিছু একটা করে বোধহয়। লকডাউনে সেই বন্ধুটা দারুন একখানা বাইকে চড়ে এসে ভাইটাকে দেখতে পেয়ে তাকে জিজ্ঞেস করে গেছে - "এই বলতো আমাদের ব্যাচে তুই ছাড়া আর কি কেউ বেকার আছে?" এমন ক্ষত বুকে নিয়েই আমাদের চলা।
এমন পরিস্থিতি হয় যে, তুমি WBCS প্রিলিমিনারি পাশ করেছো অথচ Miscellaneous প্রিলিমিনারি পাশ করতে, কোনও পরীক্ষার শেষ ধাপে পড়ার ব্যাচেই অন্য বন্ধুর নাম উঠলেও তোমার নাম নেই, এটায় ও হলোনা সেটাও হলোনা। এই সব চলতে চলতে বছরের পরে বছর দূর্গাপূজা পার হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তোমার মন ফুরফুরে নেই। একটা না প্রকাশ পাওয়া কষ্ট বুকে চেপে আছে, যান্ত্রিক হাসি হাসছো বটে কিন্তু মনে শরতের কাশফুল দুলছে না।
একটা জিনিস আমি খেয়াল করেছি, আমি যতোই চাকরি পাবার মুখের দিকে এগিয়েছি, এমন পরিস্থিতি বেড়েই চলেছিলো। একদিন নিজের নামটা খুঁজে পেলাম অনেকের নামের ভীড়ে, আর এক লহমায় এই অত্যাচার থেকে মুক্তি।
আমার সেই সমস্ত ভাই ও বন্ধুদের নাম এখানে উল্লেখ করলাম না, কারণ সকলকে facebook এ খুঁজে পেলাম না। আমি সেদিনই খুশী হবো যেদিন সবাই সাফল্য পাবে এবং এক বৃষ্টির দিনে ফুটবল খেলে খিচুড়ির বন্দোবস্ত করবো, সবাই মন খুলে মজা করবো। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সেই কাঙ্ক্ষিত দিন জলদি আসবে।
কলমে - পার্থ সারথি মণ্ডল
Ps - the world of government job/chakri is a tuff place to get in, especially in West Bengal, don't give up and believe you can.
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Your comment is valuable to us thank you and please subscribe through email