কেন ধর্ষকেরা ধর্ষণ করে? Why do rapists-people rape?
ভারতবর্ষকে এক সমীক্ষা, মহিলাদের জন্য পৃথিবীর সবথেকে নিরাপত্তাহীন রাষ্ট্র হিসাবে তুলে ধরে। মহিলাদের জন্য পৃথিবীর সবথেকে নিরাপত্তাহীন রাষ্ট্র ভারত কি না, তা নিয়ে মতবিরোধ থাকতেই পারে, তবে ভারত বর্ষ যে প্রথম ১0 দেশের মধ্যে আসবে, এটা কঠোর সত্য। এখানে বলে রাখা ভালো, ধর্ষণ এর শিকার শুধুমাত্র মেয়েরাই হন না, পুরুষেরাও বিভিন্নভাবে যৌন আগ্রাসনের শিকার হন।
সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রত্যেক তিনটি মেয়ের মধ্যে একজন যৌন আগ্রাসনের শিকার, আবার প্রত্যেক চারটি ছেলের মধ্যে একজন, কোন না কোনভাবে যৌন আগ্রাসনের শিকার হয়েছেন, নিজেদের জীবন কালে।
মহিলা দের প্রতি যৌন আগ্রাসনের পরিসংখ্যান, statistics of sexual harassment faced by Women
- প্রত্যেক ৫ মহিলার মধ্যে, একজন অন্তত কোন না কোন সময় নিজের জীবনে ধর্ষিত হয়েছেন বা তাদের ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে।
- প্রত্যেক তিনজনের মধ্যে একজন মহিলা, যিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন,তখন, যখন তাঁর বয়স ছিল ১১ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে।
- প্রত্যে ৮ জনের মধ্যে, একজন মহিলা যিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, তখন,যখন তাঁর বয়স ছিল ১০ বছরের নিচে।
পুরুষদের প্রতি, যৌন আগ্রাসনে পরিসংখ্যান, statistics of sexual harassment faced by Men.
- প্রত্যেক ৩৮ জন পুরুষের মধ্যে, একজন অন্তত নিজের জীবিত কালে ধর্ষিত হয়েছেন, বা তাদের ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে।
- প্রত্যেক ৪ জন পুরুষ যারা ধর্ষণের শিকার, এরমধ্যে অন্তত ১ জন পুরুষ, ১১ থেকে ১৭ বছর বয়সের মধ্যে ছিলেন যখন তাদের সাথে এই ঘটনা ঘটে।
- প্রত্যেক ৪ জন ধর্ষিত পুরুষের মধ্যে ১ জন ধর্ষণের শিকার হন ১০ বছর বয়সের নিচে।
এই সমীক্ষা থেকে অনেকটা স্পষ্ট, ধর্ষক মানসিকতার, ক্ষেত্রে ‘লিঙ্গ বৈষম্য' অন্যতম কারণ হলেও,প্রধান কারণ নয়। তবে, কেন ধর্ষকেরা ধর্ষণ করছে ?
যখন আমরা, আমাদের আশেপাশের মানুষদের সাথে কথা বলি, তখন দেখি প্রতিটি মানুষই, এই ধর্ষক মানসিকতার প্রবল বিরোধি, তবুও আমাদের দেশে তথা পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত ধর্ষণের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
স্যার আর্থার কোনান ডয়েল, তাঁর রচিত, শার্লক হোমস চরিত্র কে দিয়ে অদ্ভুত কথা বলিয়েছেন। শার্লক বলেছিলেন -
“ একজন স্বতন্ত্র মানুষের চিন্তাধারা সবসময়ই ধাঁধা এর মত কিন্তু অনেক স্বতন্ত্র মানুষ নিয়ে গঠিত একটি সমাজের চিন্তা ধারা গাণিতিক সত্য "
তাই স্বতন্ত্র বিকৃত চিন্তাধারার অধিকারী, ধর্ষকদের ,মনোভাব বোঝার জন্য আমাদের সেই সমাজকে পর্যাচলনা করতে হবে, যে সমাজ থেকে ধর্ষকেরা উঠে আসছে।
কেন ধর্ষকেরা ধর্ষণ করছে সেটা বোঝার জন্য সামাজিক বৈজ্ঞানিকরা একটা গবেষণা করেন, এবং উঠে আসে রেপ কালচার (rape culture) নামক থিওরি টি। এই থিওরির মতে একটি ধর্ষকের, ধর্ষক মানসিকতা একদিনে গড়ে ওঠে না, বিভিন্ন সামাজিক সহিষ্ণুতা ( social tolerance ) ও মনোভাব একজন সাধারণ নাগরিককে ,ধর্ষক গড়ে তোলে। অবাক ব্যাপার এইযে তারা মনেই করে না যে, তারা কোন জঘন্য অপরাধ করছে।
এবার প্রশ্ন হয় কিভাবে এই মানসিকতা গড়ে ওঠে? How does the mentality of an indiviual grows to become a rapist mentality from a non rapist mentality.
উপরে দেওয়া চিত্রটিতে, যখন আমরা নিচের থেকে উপরের দিকে উঠি, সামাজিক মান্যতা ও সহিষ্ণুতা
কমতে থাকে।
কিরকম?
ধরুন স্বল্প পরিচিত বা অপরিচিত প্রায় কেউ যখন আমাদের রেপ জোক ( rape joke ) পাঠায় কিংবা তাদের সাধারণ কথাবার্তার মধ্যেই যৌনতার ইঙ্গিত ঝিলিক মারে তখন আমরা ওটাকে মজা, ফ্লার্টিং ইত্যাদি হিসাবে উড়িয়ে দি। এই ধরনের কথাবার্তা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য।
এরপরের পর্যায় আসে ক্যাট কলিং (cat calling ) যেমন ‘ওহ কি লাগছে' , ‘আরে পুরো আগুন', ইত্যাদি।কিংবা অযাচিত অযৌন ছোঁয়া যেমন পিঠে হাত দেওয়া, ঘারে হাত দেওয়া, হাতে হাত দেওয়া। কিংবা স্টকিং (stalking) বা পিছু নেওয়া। যেখানেই যাচ্ছেন তাকে দেখতে পাচ্ছেন, বারবার আপনার সামনে চলে আসছে সে। এই পর্যায়টি আগের থেকে একটু কম গ্রহণযোগ্য দু-একবার ভুরু কুঁচকে গেলেও আমরা কিছু বলি না।
এর উপরের পর্যায়ে আসে, যৌনাঙ্গ প্রদর্শন ও নিজের নুড {(জামাকাপড় হীন )(nude)} ছবি পাঠানো।
আমি আমার পরিচিত, বেশ কিছু মেয়ের সাথে কথা বলে দেখেছি তাদের প্রত্যেককে এই পর্যায়ের ধর্ষক মানসিকতার মানুষ একইভাবে বিধ্বস্ত করেছে। এবং প্রত্যেকেই নিজের সুরক্ষার জন্য, এগুলিকে দেখেও না দেখার ভান করে এগিয়ে গেছে। অর্থাৎ এই পর্যায়ে যখন ধর্ষক মানসিকতার মানুষ অপরাধ করছে, তখন বিষয়টি সামাজিক স্বীকৃতি না থাকা সত্বেও, তাদেরকে প্রতিরোধের ,সম্মুখীন হতে হচ্ছে না। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস তৈরি হচ্ছে তারা এটা করতেই পারে।
এরপরের পর্যায়ে আসে শ্লীলতাহানি বা গ্রপিং (groping)
এই ক্ষেত্রেও আমি আমার পরিচিত ১০ জন মেয়েকে, প্রশ্ন করি তাদেরকে এই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে কিনা, এবং তারা কি করেছে। অদ্ভুতভাবে ১০ জনের মধ্যে ৬ জন এই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে এবং ২ জন ছাড়া কেউই প্রতিবাদ করেনি সেই সুরক্ষার ভয়ে, তারা সহ্য করে গেছে, অপেক্ষা করেছে, এই সময়টি কেটে যাবার।
এই পর্যায়ের ও, অনেক স্তর আছে ধরুন আপনার পাশে বসে অপরিচিত ব্যক্তি আপনার পায়ে পা ঘষে যাচ্ছে কিংবা কনুই দিয়ে বারবার আপনার ব্যক্তিগত জায়গায় স্পর্শ করছে। এই ধরনের ‘ ধর্ষক মানসিকতা ' সাধারণত যার সাথে হচ্ছে সে আওয়াজ তোলে না, তুললেও মৃদুভাবে হাত টা ঠিক করে রাখতে বা ইত্যাদি বলে। এমনকি গ্রপিঙ বা পূর্ণ শ্লীলতাহানীর, শিকার ব্যক্তিবর্গ আওয়াজ তোলে পরিবেশ বুঝে।
এই পর্যায়ে ও, ‘ধর্ষক মানসিকতার' বিস্তার ঘটে তারা অসামাজিক, অমানবিক, কাজ করেও প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়না। তাদের কাছে এটাই তাদের প্রাপ্য অধিকার বা স্বাভাবিক ঘটনা বলে মনে হতে থাকে।
এরকম ভাবেই সামাজিক সহিষ্ণুতা ও সুরক্ষা হীনতা এর ভীতি ধীরে ধীরে গড়ে তোলে ধর্ষণ মানসিকতা।
একজন মানসিক বিকৃত ব্যক্তি যখন তার বন্ধু বর্গের সামনে এমন সব ধর্ষক মানসিকতার কাজ করেও পার পেয়ে যায় বারবার, তখন, তার বন্ধু বর্গের সমস্ত ব্যক্তির ধর্ষক মানসিকতা বৃদ্ধি পায়। তারা ভাবতে শুরু করে এটা করাই যায়, এটাই মজা, এইজন্যই ,গ্যাং রেপ বা গণধর্ষণ প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে।
ধর্ষকদের আমরাই তৈরি করছি চুপ করে থেকে ছোট ছোট বিষয়ে । আমরা, বাস, ট্রেন ইত্যাদি মাধ্যমে যাতায়াত করার সময় অনেক কিছু দেখি, হয়তো প্রতিবাদ করতে চাই, কিন্তু করিনা, যার সাথে অপরাধ হচ্ছে তাকে চুপ করে থাকতে দেখে। আর যিনি অপরাধের শিকার হচ্ছেন, তিনি চুপ করে থাকেন, এই ভয়ে, যে কেউ তার পাশে এসে দাঁড়াবে না। উল্টে তিনি ভবিষ্যতে, আরো সমস্যা এর সম্মুখীন হতে পারেন।
এই ভাবেই ‘ধর্ষকের মানসিকতা', পিরামিডের ধাপ বেয়ে ধর্ষণ ও খুন এর পর্যায় পৌঁছায়।
এই ধরনের মানসিকতা গড়ে ওঠা কে প্রতিরোধ করতে আমাদের শুরুতেই তা বন্ধ করতে হবে। “আমি তো শুধু ইয়ার্কি মারছিলাম” এই কথাটির আড়ালে যদি আপনার অপছন্দের কোন ইঙ্গিত লুকিয়ে থাকে তাহলে সেটা শুরুতেই নাকচ করতে হবে। যখনই যৌন আগ্রাসনের শিকার হবেন, তা যে স্তরেই হোক সেই স্তরেই রুখে দাঁড়াতে হবে, দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে আশেপাশের মানুষের, ব্যবহার করতে হবে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম যেমন ফেসবুক লাইভ ইনস্টাগ্রাম ইত্যাদি। মনে রাখবেন আপনার সুরক্ষা আপনার হাতে, তা কখনোই এড়িয়ে গিয়ে নয়।
সামাজিক পরিবর্তন একদিনে হয় না এটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার, বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যক্তিবর্গের সামাজিক ,শারীরিক ,মানসিক, সুস্থতা বজায় রাখতে, এগিয়ে আসতে হবে সুস্থ মস্তিষ্কের নেতা-মন্ত্রীদের। যারা পরিষ্কারভাবে তাদের অধীনে থাকা কর্মীদের এই বক্তব্যটি স্পষ্ট করে বোঝাবে যে তাদের দরকারে, সেই নেতা মন্ত্রী পাশে থাকবে, তাদের ব্যক্তিগত অপরাধে নয়।
প্রত্যেক ধর্ষক, এর পেছনে কোন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের খোঁজ পাওয়া যায়। যাদের ভরসায় বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষেরা অপরাধ ঘটায়। এখানে দায়িত্ব বর্তায় সেই নেতা-মন্ত্রীর উপর, তারা কিভাবে চালনা করবে তাদের কর্মীদের। এগিয়ে আসতে হবে আমাদের মত সাধারণ মানুষকে যারা নির্বাচন করেন নেতাদের ও মন্ত্রীদের। শুধু গান্ধীজীর তিনটে বাঁদরের মতো বুড়া মত সুনো , বুড়া মত দেখো, আর বুড়া মত বোলো , হয়ে বসে থাকলে চলবে না।নির্ভয়া ( niirbhaya ), মনীষা বাল্মীকি ( manisha valmiki ) কেস এর মত নৃশংস ঘটনা যাতে ভবিষ্যতে না ঘটে, তার দায়ভার যেমন সরকারের, তেমন ই আমাদের, অর্থাৎ সাধারণ মানুষের।
কলমে - সপ্তর্ষি সান্যাল
বর্তমান সময়ে সমাজ ব্যবস্থার সঠিক মূল্যাযন
উত্তরমুছুনধন্যবাদ, পরিবর্তন হবেই। আমি আশাবাদী।
মুছুন